ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ সরিষা আবাদ হওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। উপজেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মৌয়ালরা। এতে একদিকে যেমন মধু উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে সরিষার ফলনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মৌচাষি অনিক ইসলাম জানান, সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। পাশাপাশি মৌচাষের মাধ্যমে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সংগৃহীত মধু স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বোতলজাত করে দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে সিরাজগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, সরিষা ক্ষেতের পাশের খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে মৌমাছির বাক্স। প্রতিটি বাক্সে মোম দিয়ে তৈরি ছয় থেকে সাতটি মৌচাকের ফ্রেম থাকে এবং ভেতরে রাখা হয় একটি রানি মৌমাছি। রানি মৌমাছির উপস্থিতিতে হাজারো শ্রমিক মৌমাছি ওই বাক্সে এসে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌচাষিরা এসব চাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন।
মধু সংগ্রহে আসা মৌচাষি আব্দুস সাত্তার জানান, বিশেষভাবে তৈরি স্টিল ও কাঠের বাক্সের ভেতরে সাতটি কাঠের ফ্রেমে মোমের সিট বসানো হয়। বাক্সের ওপরের অংশ কালো পলিথিন ও চট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। একটি রানি মৌমাছির বিপরীতে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শ্রমিক মৌমাছি থাকে। কয়েকদিন পর চাকগুলো খুলে মেশিনের মাধ্যমে মধু বের করে বোতলজাত করা হয়। প্রায় ১২০টি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ মন মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সজল বলেন, “প্রতিবছর সরিষার মৌসুম এলেই মৌচাষিরা এখানে আসে। মৌসুম শুরু হলে আমরা আগেই তাদের বিষয়টি জানিয়ে দিই।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সহিদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে রাণীশংকৈলে সরিষার আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ১টি পৌরসভাসহ ৮টি ইউনিয়নে মোট ৭ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। গত বছর এ উপজেলায় সরিষার আবাদ ছিল ৬ হাজার ৪২৬ হেক্টর। কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল (উফশী) বারি-১৪, ১৭ ও ২০ এবং বিনা-১১সহ বিভিন্ন জাতের সরিষা চাষ করছেন।
তিনি আরও বলেন, “সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষ হলে পরাগায়নের কারণে ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। এতে কৃষক যেমন লাভবান হন, তেমনি বিনা খরচে মধু সংগ্রহের সুযোগ পান মৌচাষিরা। বারি-১৪ জাতের সরিষা ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই ঘরে তোলা যায় এবং প্রতি ৩৩ শতাংশ জমিতে প্রায় ৮ মন ফলন পাওয়া সম্ভব। সরিষা কাটার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করা যায়, ফলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।”
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এবার সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মৌচাষের বিস্তার ঘটায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।